Home » » kamal uddin সর্বনাশা আগষ্ট ও বঙ্গবন্ধু

kamal uddin সর্বনাশা আগষ্ট ও বঙ্গবন্ধু

Written By grameenphoto on Friday, 17 October 2014 | 00:30



মো: কামাল উদ্দিন
সর্বনাশা আগষ্ট ও বঙ্গবন্ধু


আগষ্ট মাস আসলে বাঙ্গালী জাতি যেন কলংকের মুখোমুখি হয়। তাই আগষ্টকে নিয়ে আমি একটি গবেষণা মুলক লেখা লিখতে চাই। লেখার শিরোনাম সর্বনাশা আগষ্ট ও বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান। আমি একজন স্বল্পজ্ঞানি লেখক ও ইতিহাস ভিক্ষুক। ইতিহাস ভিক্ষা করতে গিয়ে কিছুটা ইতিহাসের ধারণা পেয়েছি। আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন পূর্বক একাধিক লেখা লেখেছি এবং আজীবন আরো লেখার চেষ্টা করে যাবো। কারণ তাঁর উপর লেখাগুলো দিয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবো। হয়তো আমার এই ক্ষুদ্র লেখাসমূহ দেশের বড় বড় পণ্ডিত জ্ঞান-তাপসদের নজরে পড়বে না। তবুও ঐ পণ্ডিতদের লেখার ভাণ্ডার থেকে ইতিহাস ভিক্ষা নিয়ে লেখার চেষ্টা মাত্র। আমার নিজের কাছে, দেশের মানুষের কাছে, বাঙালী জাতির কাছে আগষ্টটা কি? বা কেন? তা পর্যালোচনা মাত্র। বিগত ২০০৮ সালের আমার “বাঁকা কথা” গ্রন্থের সর্বনাশা আগষ্টের লেখা দিয়ে শুরু করে “টকটক কথা” গ্রন্থের আহামরন লেখা এবং “সমকথা” গ্রন্থের বুলেটবিদ্ধ বুক লেখা দিয়ে শেষ করব। এর মাঝে থাকবে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের জীবনে আগষ্ট কত বড় সর্বনাশা ছিলো তা একবার ইতিহাসের পাতা খুলে দেখা দরকার।
শান্ত স্বভাবের অথচ দুষ্টুমি ছিল যার নিত্যকর্ম। স্কুল পালানোর দলনেতা হিসেবে পরিচিত ছিলাম এলাকায়। পাশাপাশি মন ও মননের উচ্চ চিন্তাধারা পোষণ করে যথাসম্ভব বাস্তবায়নের চেষ্টায় রতও ছিলাম। কিন্তু আর্থিক টানা পড়োনের কারণে আমার সব ইচ্ছা পূরণ হতো না। আমাদের পুরো পরিবারই আর্থিক সংকটের কারণে জীবন সংগ্রামে ব্যস্ত ছিলো। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী বাপ-দাদার তালুকসমূহ সর্বনাশা কর্ণফুলী নদীর ভাঙনের করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে। কোন এক বর্ষার অঝোর ধারায় আমার জন্ম। অতপর মুরুব্বিদের কাছে অনেক শুনেছি- আমাদের গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু ও পুকুর ভরা মাছ ইত্যাদির কাহিনি। তবে আমার জন্মের মাধ্যমে পুত্র সন্তানপ্রেমী পাগলি মা ও বোনেরা সাত রাজার ধন লাভ করার মতো শান্তি পেয়েছিল তা বাস্তবে দেখেছি। আমার বুদ্ধি হওয়া অবধি যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশে আমরা দল বেঁধে গ্রামের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে চষে বেরিয়েছি। কখনো উদ্যেম গায়ে, কখনো গায়ের পরিধান খুলে কোমরে বেঁধে। স্কুল থেকে আসার পথে দেখেছি যুদ্ধ বিধ্বস্ত ও নিপীড়িত গ্রামীণ জনপদের হাহাকার দৃশ্য।
পঁচাত্তরের পনেরই আগষ্ট সকালে সম্ভবত শুক্রবার ছিলো। আমাদের ঐতিহ্যবাহী চরণদ্বীপ
আব্বাসিয়া সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করতে বলেন। একই সাথেস্কুল ছুটির আগেই অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে দেন। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠার সাথে সাথে প্রধান শিক্ষক ঘোষণা দিলেন আজকে বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত শোক ও পরিতাপের দিন। তোমরা হয়তো এখনো জান না, গতরাতে আমাদের মাতৃভূমিতে কি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে? সেই দিন শিক্ষকের মুখ থেকে সবিস্তারে শুনেছিলাম বাংলাদেশের স্থপতি, রাষ্ট্রপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। রেডিও মারফত অনেকেই এ খবর শুনেছেন। তিনি উদ্বেগের সাথে বললেন, তোমরা সবাই বাড়িতে চলে যাও। পরবর্তীতে স্কুল খোলার ঘোষণা আসলে খবর দেয়া হবে। সে দিনের আধো বোধশক্তিতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খরব আমাদের মনে কোন বিশেষ রেখাপাত করেনি। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ পেয়ে অতি খুশিমনে ক্লাস ফাঁকিবাজ দলের সদস্যরা মনের সুখে বাড়িতে ফিরি। আমার মধ্যে কোন ধ্বংসের রেখাপাত সৃষ্টি না হলেও সেইদিন আমার জন্মদাত্রী মা-ই বুঝতে পেরেছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মাধ্যমে মাতৃভূমির কি অপরিসীম ক্ষতি সাধিত হয়েছে। তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন তার মলিন চেহারার মধ্যে আমি গোটা বাঙালি জাতির জীবনে ধ্বংসের একটি ছাপ লক্ষ্য করেছিলাম যা পরবর্তীতে আমি কিশোর বয়সে ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছি। মা আমাদের দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন বিষয়ে অনেক কাহিনি শুনিয়েছেন, যা তিনি সচক্ষে দেখেছেন। আমাদের বাড়ি কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ কোলঘেঁষা হওয়াতে মুক্তিযোদ্ধারা নদী পার হওয়ার কালিন আমাদের ঘরে অনেক সময় আশ্রয় নিতেন। সেই সুবাদে মুক্তিবাহিনীদের কাছ হতে শেখ মজিবুর রহমান সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়েছে। ঐ ১৫ আগস্ট এর নির্মমতার কথা পুরো আমলে না আনলেও কিন্তু সেই সর্বনাশা আগষ্ট যখন দীর্ঘবছর পর ১৯৯৭ সালের ১১ আগষ্ট আমার প্রাণপ্রিয় ছোট ভাই টগবগে ঊনিশ বছরের যুবক আকতার উদ্দিন অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসী কর্তৃক অপহরণ হওয়ার পর জীবন্ত অথবা লাশ হয়েও অদ্যাবদি ফিরে না পাওয়া সেই শোকে পুত্র পাগলিনী মা সত্যিসত্যি পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক বিভাগে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর ২০০১ সালের সর্বনাশা অন্য একটি আগষ্টের ২ তারিখ আমার মমতাময়ী মা আমাদের ছেড়ে তার নিরুদ্দেশ ছেলে আকতারের কাছে চলে গেলেন। সেই ১৫ আগস্ট দেশে যে পচন ধরেছে তা এখন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। নিখোঁজ ভাইয়ের ব্যাপারে মাকে অনেক মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলাম। দৈনিক পত্র পত্রিকায় এ সম্পর্কীয় অনেক সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। বোয়ালখালী থানা, বন্দর থানা ও অন্যান্য যে সব থানায় অজ্ঞাত লাশের সংবাদ যখনই পেয়েছি, পাগলের মতো ছুটে গিয়েছি ভাইয়ের
খোঁজে। কিন্তু জীবিতবস্থায় মাকে তাঁর নিখোঁজ পুত্রের কোন খবর পৌঁছাতে পারিনি। যা আজও কষ্ট দেয় আমার বিবেককে। সেই ভয়াল আগস্ট মাসে ভাইকে হারালাম, হারালাম মাকেও। স্নেহময়ী মাকে হারানোর শোক শেষ হতে না হতেই পনের দিনের মাথায় আগস্টের ১৭ তারিখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় আমার মেজ বোনের অকাল মৃত্যু ঘটে। একে একে এতো শোকাভিতূত ঘটনা আমার জীবনে ঘটার পাশাপাশি এই আগস্টে জাতীয় জীবনে দেখা দিয়েছে একাধিক ঘটনা। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা হামলা, ১৭ আগস্ট সারা দেশে সিরিজ বোমা হামলা।
জাতীয় জীবন ও আমার ব্যক্তিগত জীবনে আর কতবার ফিরে আসবে এই হিংসুটে আগস্ট আমরা কেউ জানি না। আমরা আর কতকাল এই বর্বরতার শিকার হবো। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই আগস্ট মাসে কি কি সমস্যার সম্মুখিন হয়েছিলেন উল্লেখ পূর্বক আগস্টকে পর্যালোচনামুলক একটি প্রবন্ধ গ্রন্থ প্রকাশের চেষ্টা করব।

লেখক: সাংবাদিক,প্রাবন্ধিক , গবেষক, মানবাধিকার কর্মি ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ,বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি।

0 comments:

Post a Comment