Home » » ২৯ শে এপ্রিল কুতুবদিয়ায় ৪ তালগাছের উপরে মাঁচা বেঁধে বেচে ছিলাম -ওসমান জাহাঙ্গীর

২৯ শে এপ্রিল কুতুবদিয়ায় ৪ তালগাছের উপরে মাঁচা বেঁধে বেচে ছিলাম -ওসমান জাহাঙ্গীর

Written By grameenphoto on Tuesday, 31 May 2016 | 07:08


প্রতিবছর ২৯ এপ্রিল দিনটি এলেই দক্ষিণ উপকুল অঞ্চলের বাসিন্দারা আতকে উঠে। কি ভয়াবহ ছিল এই ঘূর্ণিঝড়টি তান্ডব। আামি সেই দিন কুতুবদিয়ায় ছিলাম। ১৯৯১ সনে আমি কুতুবদিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পূর্ব প্রস্তুতির লক্ষ্যে বড় ঘোপে রোমাই পাড়ায় গোলাম মাসুদ মাষ্টারে বাড়ীতে ছিলাম। ঘূর্ণিঝড়ের ৩দিন আগে২৬ এপ্রিল  শুক্রবার আমি নিজবাড়ী মহেশ খালী থেকে ইঞ্জিন বোডে করে কুতুবদিয়ায় আসি। সেই দিনও আবহাওয়া বার্তা পূর্বাবাস ২নং সতর্কবাণী রেডিওতে প্রচার করেছিল। ঘূর্ণিঝড়টি বঙ্গোপসাগরে প্রায় কয়েকশত মাইল দূরে অবস্থান করছিলাম। আকাশ ছিল ঘুম ধরা এ অবস্থায় কুতুবদিয়া আসি তখন আমার জেটার বাড়ীতে ধান মাড়ায়ের কাজ চলছিল । আমি পরদিন ২৭ এপ্রিল শনিবারে কলেজ গেলাম। তখনো আকাশ মেঘলা ।  কুতুবদিয়ার সাগর পাড়ের  ঢেউ কেমন যেন ভয়ানক উত্তাল। বড়খোপ বাজারের পশ্চিমে পার্শ্বে পাথরের স্লেপ বসানো বেঁড়িবাধে  বড় বড় ঢেউ এসে পড়তে লাগলো, তা মানুষ ভিড় করে দেখছিল।কলেজ থেকে ফেরার পথে আমি ও এ দৃশ্য দেখলাম। কেমন যে অশনি সংকেত সমুদ্রের পানি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে। বিপদ সিগন্যাল  ।  পরদিন রবিবার কলেজে যেতে গিয়ে শুনি, ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করেছে। রবিবারেও সূর্যে ধুসর মেঘ ঢাকা, বাতাস নেই। প্রাকৃতি নিরব রাগে ফুসে উঠছে।  ২৯ এপ্রিল সোমবার সকাল বাতাসের গতি পূর্ব উত্তর থেকে বইতে শুরু করেছে। কক্সবাজার উপকূল অঞ্চলকে ১০ নং মহা বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হচ্ছে। আমার জেটাতো ভাই  আহমদুর রহমান  প্রকাশ কালাইয়া, আমি দুজনে পরামর্শ করলাম পানি এসে গেলে আমরা কি করতে পারি। দুজনে বুদ্ধি করলাম। তাদের বাড়ীর প্রবেশ পথে , রাস্তার পাশে পুকুরে পাড়ে চারটি তালগাছ  প্রায় কাছাকাছি রয়েছে, প্রায় ২০ হাত উপরে মাচা বা টংগী করা যাবে। তখন ঝড় বাতাস শুরু হয়নি। সকাল ১০ টার দিকে, দুজনে বড়ঘোপ বাজারে গিয়ে দড়ি কিনি, সবাই বলা বলা বলি করছে আমরা নাকি পাগলা হয়ে গেছি। আমরা দুজন বাইর¹া বাশ কেঠে প্রায় ২০ হাত উপরে মাচা তৈরি করি। দুপুরে দিকে মাচার বসার জন্য পাহাডি পাইয়ে বাঁশকে সারি সারি করে বেঁধে ফেলেছি। তখন ঝড় বাতাস শুরু হয়ে গেছে। রেডিওতে শুনছি ঢাকার বুড়িগঙ্গাসহ উপরে সব নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। ঘুণিঝড়টি কক্সবাজার থেকে ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থা করছিলো। বিকাল ৪ টার সময় আমার জেটা গোলাম মাবুদসহ দাদী, জেটি মা, ছোট বোন খুকী, অন্যান্য সবাই প্রায় অর্ধ কিলোমিটার দূরে একটি ২ তলা মাদ্রাসায় আশ্রয় নিতে চলে গেল তাদেরকে পৌছে দিতে গিয়েছে আহমদ রহমান কালাইয়া । আমি  আর  রুনো আপা রয়ে গেছি। রুনো আপা রয়ে গেছে ঘরে অনেকগুলো কাজ করতে হবে। আমি আর রুনো আপা অপেক্ষায় আছি কখন আহমদ রহমান কালাইয়া আসবে। প্রচন্ড সেড়বৃষ্টি, সাথে ধমকা বইছে। দশ মিটার দূরের বস্তু দেখা যাচ্ছে না ঝড় বাতাসের কারণে। সন্ধ্যা ৬টা বেজে গেছে আহমদ রহমান আসছে না। খুব চিন্তা পড়ে গেছি সে এসে রুনো আপাকে নিয়ে যাবে, আমি এবং আহমদ রহমান  এখানে থেকে যাবো এটাই ছিল সবার সিন্ধান্ত। ঘরে অন্যান্য সদস্যরা চেয়েছিল আমি যে তাদের সাথে বিল্ডিং চলে যাই কিন্তু আমি যেতে চাইনি, আমার ইচ্ছে ছিলোর ঘুর্ণিঝড়ের তান্ডব নিজ চোখে দেখবো। রাত ৮টার সময় আমি অজু করে তওবার নামাজ পড়ে নিলাম। তারপর লইটিয়া মাছের তরকারী দিয়ে ভাত খেলাম  রুনো আপা আমাকে দিয়ে ঘরে বইপত্রগুলো ঘরে ছাদে তুলে রাখে।  ঘরটি ছিল ষাড় দশকের বড় বড় দেওয়ালের তৈরি মাটির ঘর। ঘরে চাল ছিল শনের চাউনি। ঘরে ছাদটি ছিলো বাঁশের বেড়ার।  আমার হাতে কিছু টাকা পয়সা ছিলো সব একটি গাছের আলমারী  ভিতরে রাখে দিই। রাত ৯ টার দিকে আহমদ রহমান  ঝড় তুফান মাথায়  নিয়ে অনেক কষ্ট করে এলো। রুনোকে নিয়ে মাদ্রাসার বিল্ডিং এ যাওয়ার পরিস্থিতি আর রইলো না। তিনজনেই সিন্ধান্ত নিলাম পানি যদি  চলে আসে তবেই তিন জনেই মাঁচায় চলো যাবো। মাঁচাচি ছিল ঘর থেকে পূর্ব ১৫০ মিটার দূরে। পুকুর পাড় অনেক উচু সেই পাড়ারে উপর চারটি তালগাছের উপর মাচাটি  তৈরী করেছি ,মাঁচায় উঠার জন্য একটা সিড়ি তৈরী করেছি উত্তর পার্শ্বে । সিড়িটি মাঁচায় সাথে বাঁধা ছিলো। রাত বাড়ছে ঝড় বাড়ছে প্রতি মিনিট পর পর রেডিও সতর্ক বাণী প্রচার হতে সাথে কিছু অধ্যাধিক গান ও চলছে।
যে ঘরে আছি ঘরটি দুই দিকে দুয়ার ছিলো চারিপার্শ্বে বারান্দা, পূর্বদিকে এবং দক্ষিণ দিকের বারান্দা বাতাসে উডায়ে নিয়ে গেছে। রাত ১১ টার দিকে আহমদ রহমানের ছোট চাচা এসেছে জানালো তাদের ঘরটি উপড়ে ফেলেছে তিনি একটা কাঁথা গায়ে দিয়ে এসেছে। এখন আমরা আল্লাহর চারবান্দা পানি আমার অপেক্ষায় আছি। বাতাসের গতিবেগ ঘন্টায় ২৩৫ কিলো, ঘূণিঝড়টি নাম হারিকেন । হারিকেনের ব্যাস ছিলো ৭৫ কিলোমিটার। এসব তথ্য রেডিও থেকে চারদিন প্রচার করছিল। বাতাস ঝড়  তান্ডবে চারিদিকের পরিবেশ যেন সত্য হতে চলছে। রুনো আপা কিছুক্ষন পরপর পশ্চিম পাশের জানালায় দিয়ে টর্চ লাইটে আলো মেরে পানি আসছে কিনা দেখছে। আব্বাস উদ্দিনের একিট মরমী গান রেডিওতে বাজছে, আহমদ রহমান জানালো দিয়ে টচ মেরে দেখেই তার চোখ কপালে । চিৎকারে করে বলে উঠে পানি এসেছে আমরা বাচবো না।   তখন রাত ১২ টা ৩০ মিনিট । আমি অত্যন্ত ধর্য্য সাথে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করি। রুনোকে বলি, তুমি দুটি শাড়ী নাও। সে ছিলো সেলোয়ার কামিজ পরিহিত। শাড়ি নিতে বলার কারণ হচ্ছে ,মাঁচাতে নিজেদের শরীরকে বেঁধে ফেলা। কোথাও ভেসে গেলে গাছে সাথে শরীরকে বেঁধে রাখা। আমি পরণে দুটি লুঙ্গি গায়ে দুটি শাট গায়ে দিয়ে চারজন হাতে ধরে পূর্ব দরজা দিয়ে ঘর থেকে বের হই। উঠোনে নামতেই গলা পর্যন্ত পানি।পানির প্রচুর চাপগতি ছিল ।পানি  ও বাতাসের চাপে রুনো আপা আহমদ রহমান আমাদের হাত থেকে ছুটে যায়, আমি ও চাচাকে পানির স্রোতে ভিটার উত্তর পাশের এক তালগাছে গিয়ে ঠেকী। তখন চাচা আমাকে বলে, বাবা জোয়ান ছেলে তুমি মাঁচায় যাওয়ার চেষ্টা করা ওরা (রুনো আহমদ রহমান) মাঁচা পৌছে। তারা মাঁচায়  উপর থেকে  টর্চ লাইটে সিংগেল দিচ্ছে আমরা যেন মাঁচায় যাওয়ার চেষ্টা করি ।  চাচা আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিল। আমি চেষ্টা করছি পুকুরে উত্তরে পাড়ে উঠতে কিন্তু পারছিনা। বাতাস এবং পানির স্রোতের  চাপে একটা তালগাছ ধরে খোদা কাছে আয়ু প্রার্থনা করলাম। তারপরে কেমন যেন  এক অদৃশ্য শক্তি আমার শরীরে এসে গেল, পূর্ব দক্ষিণে কোনাকোনী সাঁতার দিয়ে পুকুর পাড়ি উঠে গেলাম। পুকুর পাড়ে বৈশিষ্ট্য ছিলো সারি সারি গাছ আর গাছ আমাদের মাঁচাটি পুকুরে অগ্নিকোণ বা দক্ষিণপূর্ব কর্ণারে ছিল। আমি যখন উত্তর পাড়ে উঠেই একটি আম গাছ ধরে বাতাস পানির ¯্রােতের চাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করে একটা পর গাছ ধরে পূর্ব পাড়ে চলে যাই  । এই পাড়ে সর্ব দক্ষিণে মাঁচাটির অবস্থান।সমস্থ পূর্ব পাড়টি ছিল বাঁশঝাড় ,বাঁশগুলো বাতাসের  চাপে মাঠিতে লুটে পড়েছে। আমি বাঁশগুলো ধরে ধরে মাঁচায় সিড়ি বেয়ে উপরে উঠি আসি। রুনো আপা, আহমদ রহমান ,চাচার কথা জানতে চাইলো, তিনি আমাকে বিদায় দিয়ে কোথায় গেছে জানি না। চারটি তাল গাছের উপর মাঁচা হলেও সাথে ২টি সুপারি গাছ মাচাঁর সাথে রাগানো । পার্শ্বে একটি শিশু বটগাছ ছিলো। সুপারি গাছগুলো ও মাচার সাথে বাঁধা ছিলো। বাতাসে চাপে  মাঁচার তলানী থেকে কিছু পাইয়ে বাঁশ বের হয়ে যাচ্ছিল, রুনো আপা হাতে থাকা শাড়ীটি কাজ দিলো ওটা দিয়ে বাঁশগুলো আবার বাঁধতে শুরু করে দিলাম। উত্তর মুখী রুনো মাচার উপর ১টি তালগাছ ধরে বসে আছে, আহমদ রহমান বোনকে জড়িয়ে ধরে আহমদ রহমান খালি গায়ের থাকায় ঝড় বৃষ্টি চাপ সইতে পারিছিলো না। কিছুক্ষণ পর এসিড় বৃষ্টি হচ্ছিল। পানি বাড়ছিল আমাদের মাঁচার কাছাকাছি পানি চলেে এসেছে ।কিছু উত্তাল ঢেউ মাঁচায় এসে পড়ছিল । মনে হচ্ছিল পানি মাঁচার অতিক্রম করবে কিনা , তিন জনেই দোয়া ইউনুছ পড়ছিলাম। যতক্ষণ দোয়া ততক্ষণ পর্যন্ত তান্ডব কিছুটা কম মনে হয়। মনে হচ্ছিল আমাদের দিকে বিশাল ঢেউরের আসছে।চারিদিকে পানি আর পানি বিশাল ঢেউয়ের তরঙ্গ। আমাদের মাঁ বঙ্গোপ সাগরের মাঝে এ সময় বিভিন্ন মাছ ধরার ট্রলার গুলো ঝড়ের স্রোতে আমাদের মাঁচার পাশ্ব দিয়ে চলে যাচ্ছে। অনেকগুলো কাঠের ঘরে চালা ভেসে যাচ্ছিল। কিছু ঘরে কিছু কিছু মানুষ দেখা যাচ্ছিল জীবন্ত মানুষ ভেসে যাচ্ছিল। পানি গতিটি ছিল উত্তর পূর্ব মুখী।দক্ষিণ পশ্চিম থেকে পানি গতি সাথে ছিল বড় বড় ঢেউ। কুতুবদিয়া বঙ্গোপসাগর যায়নি বঙ্গোপসাগর কুতুবদিয়ার উপরে এসে গেছে। ভয় যেন কুকড়ে খাচ্ছে যদি মাঁচার টংটির ভেঙ্গে যায়। চোখের সামনে অনেক গাছ কাত হয়ে পানিতে ডুবে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর গরম পানির বৃষ্টি হচ্ছে। পরে জেনিছি এগুলো এসিড বৃষ্টি। রাত ৩টার দিকে বাতাসের গতি কমেছে। ৪টার দিকে পানি করতে করেছে। মাঁচা থেকে নেমে পুকুর পাড়ে ব্যায়াম শুরু করি। যেহেতু আমাদের শরীর তাপমাত্রা নেমে গেছে। প্রচন্ত শীত লাগছে বাতাসের গতি কমে গেলেও কিছুক্ষণ পর পর ঝড়ো হওয়া আসে। ভোর পাচঁটার দিকে সড়ক থেকে পানি নেমে যাই ওখানে দেখি কয়েকশত মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। আমি আ্হামদ রহমান রাস্তায় বিভিন্ন দৃশ্য। লাশ আর ভাংগা ঘর বাড়ি গাছ পালা।ু সকালে জেটারবাড়ী সবাই সুস্থ শরীরে আশ্রয়স্থল মাদ্রাসা থেকে ফিরেছে। কিন্তু তাদের আতœীয় আমার কলেজ বন্ধু খসরু তার পিতাসহ মৃত্যু ঘটনায়ঐ পরিবারে শোকের ছায়া নেমে আসে। আমাদের আশে পাশে কয়েকটি স্বপরিবারে মৃত্যু ঘটনা আমাকে খুব ব্যথিত করে। এরপর আমি ১৪ দিন কুতুবদিয়া অবস্থা করি,ঘূনিঝড়ে বিধস্থ- আত্মীয়দের ঘর তৈরি করা বিভিন্ন ভাবে সাহায্য করি। ঘূর্ণিঝড়ের তিনদিন পর আমার চাচাতো ভাই জনি, ফুফাতো ভাই হুমায়ুন আমার খোজে মহেশখালী থেকে এসে আমার কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। আত্মীয়দের ঘরবাড়ী তৈরী করার ক্ষেত্রে শ্রম দিয়ে সাহায্যে করা। ১৪ দিন পর আমি ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে মহেশখালী চলে আসি।সেই   ঘূর্ণিঝড়ের পরদিন সকালে উদ্ধার অভিযান চালালে মৃত্যুর হার অনেক কম হতো 

0 comments:

Post a Comment