আগামী ২৫ জানুয়ারী আমার মায়ের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী ও কিছু স্মৃতি
-------------------------------------------
মরিয়ম খানম আমার জননী, ২০০৬ সালে ২৫ জানুয়ারী হঠাৎ করে আমাদেরকে শোকের সাগরে ফেলে চলে গেলেন, না ফেরার দেশে । আজ ৯ বছরের হতে চলছে তিনি আমাদের মাঝে নেই । আমার পুরো জীবন জুড়ে রয়েছে চিন্তায় স্মৃতিতে ,প্রতিমূর্হুতে তার চিন্তার দর্শন ও প্রেরণা আমার মাঝে কাজ করে । সব চাইতে বেশী কষ্ট দেয় আমি যে কষ্ট তাকে দিয়েছি তা মনে পড়লে। আজ ২৫ জানুয়ারী আমার মায়ের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী । সবার কাছে দোয়া চাই । তিনি জীবনের বেশীর সময় দু:খ ও কষ্টের মধ্যে দিয়ে আমাদের ৫ সন্তানদের মানুষ করেছে । আব্বা সরকারী চাকুরী করতেন দেশ স্বাধীনতা আগে কক্সবাজারের পোষ্টীন হলে কক্সবাজারের বসবাস করি টেকপাড়ায় কাঠের তৈরী ভাড়া ঘরে থাকতাম ।আমরা ভাইবোন দুজন । আমি সবার বড় আমার ছোট বোন জাহান আরা পুতু । যুদ্ধ শুরুর আগে আব্বাকে কক্সবাজার থেকে বদলী করা হলে তিনি আমাদেরকে মহেশখালী দাদার বাড়ী পাঠানোর ব্যবস্থা করে । কচ্ছুরা ঘাটে একটদিন সকালে ষ্টীমারে তুলে দেয় মহেশখালী যাওয়া জন্য আমাদের সাথে ছিলেন আমাদের ছোট চাচা । তিনি আমাকে বোন পুতু মাকে নিয়ে চাচা আমাদেরকে গ্রামের বাড়ী মহেশখালী উত্তর নলবিলা নিয়ে যাবে ।মহেশখালী দ্বীপটি পাড়ে ওয়াই ডাব্লিও ডি এ অফিস ছিলনা সেই কারণে বদরখালীর পাড়ে নেমে ডিঙ্গি নৌকায় করে মহেশখালী পাড়ে যেতে হবে । আব্বা ১৯৭৫ সালে আন্দোলন করে মহেশখালী পাড়ে ষ্টীমার ভিটতে বাধ্য করে। আমাদের বাবা সেইদিন ছোট চাচা বদরুল আলম আনচারীকে বাবা ডাকা জন্য বলেছিল তার কারণ পরে জেনেছি সামনে যুদ্ধআসন্ন সেই সময় আব্বা নাও ফিরতে না পারে ।সেই কারণে চাচাকে বাবা ডাকার জন্য বলেছিল । আব্বা জেটি দাড়িয়ে আছে ষ্টীমার ছেড়ে দিয়েছে আব্বা তখন কাঁদছেন আমি কাঁদছি আমার মা ও কাঁদছে । জেটিটা আমাদেরকে অনেক দুরে ষ্টীমারটি চলে এসেছে আব্বাকে আর দেখা যাচ্ছেনা আমি খুব কাঁদছি ষ্টীমারের এক কর্মকর্তাকে দিয়ে ষ্টীমারের ইঞ্জিণ ঘরে নিয়ে গেল সে আমার কান্না থামানো জন্য আমাকে পুরানো বাল্ব দিয়েছিল সেগুলো আমি পানিতে ফেলে দিলাম । কয়েক ঘন্টা জার্নির পরে ষ্টীমার থেকে নেমে ধোয়া ঘাট (আমাদের গ্রামের প্রবেশদ্বার) থেকে প্রায় দেড় মাইল পথ হেটে হেটে দাদার বাড়ী পৌছি। দাদা ঘরে চাচার জন্য আলাদা ঘর ছিল । সেই ঘরে একটি চকিতে সাদা বিছানা ছিল দুটি বালিশ মূয়ুরের ছবি আঁকানো সেখানে আব্বা জন্য খুব কেঁদেছি ।কয়েক মাসের মধ্যে আমি ও বোন পুতু খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি,দাদারবাড়ীর সবাই বলতেছে আমরা ভাইবোন পিতার জন্য অসুস্থ হয়ে পড়েছি । আব্বাকে চিঠি লেখা হলো তিনি এলেন আমাকে কক্সবাজারে চিকিৎসার নিয়ে যায় । দাদা ঘরে থাকার কারণে আমার মা জাঁদের গোতানি সইতে হতো,আব্বা নিজে আয়ে টাকা দিয়ে দাদার ভিটেয় ঘর বাঁধলেন । আমার দাদার ৭ পুত্র মধ্যে ৬ ছেলেদের জন্য তিনি ঘর বেঁধে দিয়েছে । আব্বা চাকুরীর করার কারণে আব্বাকে ঘর বেঁধে দেয়নি । আমার অনেক কষ্ট করে মাটির ঘরটি নির্মাণ করে এর মধ্যে বোন হোসেনে আরা ডলির জম্ম হয় ।।যুদ্ধ শুরু হলে তখন আব্বা কক্সবাজার বদলী হয়ে আসে ।আমার দাদী প্রতিদিন বিলাপ করে ছেলের জন্য আমাকে রাস্তায় গিযে পথ চেয়ে থাকে আর আমাকে বিলাপ করে । একদিন রাতে আব্বা আসেন আমার জন্য একটি রিক্সা আনে । প্রতিদিন ভোরে বিকট শব্দ শুনি । আবার চলে যায় চাকুরী স্থলে ।প্রতিদিন শুনি এই আসলো( পাঞ্চাবী) হানাদারকে (স্থানীয় ভাষায় আমাদের গ্রামে )পাঞ্চাবী বলতো মুক্তিযোদ্ধাদের লাল বাহিনী বলতো । এই আসলো শুনার সাথে আমারর মাকে নিয়ে বাসাক পাতার জঙ্গলে লুকাতাম আমাকে পাটিয়ে খবর নিতেন পাঞ্চাবী এসেছে কিনা ।আম্মা হালে ধান মাটির নিচে গর্ত করে উপরে পাটি দিয়ে তার কাচা মাটি উপরে ঘাস লাগিয়ে দেয় । পাঞ্চাবী হানাদার পাড়া পর পাড়া জ্বেলে দিচ্ছে যদি আমাদের ঘর জ্বেলে দিলে সারা বছরের খাদ্য যেন রক্ষা করা যায় । আমি ও আর দুবোন নিয়ে মা গ্রামে একা ঘরে থাকতেন । মাঝে মধ্যে আলকুয়ারী মা সাংবাদিক আহমদ হোছাইনের মা রাতে আমাদের ঘরে থাকতে আসতেন । আমার চাচতো বোন নুরিদাও মাঝে মধ্যে থাকতেন । স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আমার তৃতীয় বোন আনারের জম্ম হয় । আমরা আবার কক্সবাজারের নিজে ঘরে চলে আসি। বৈদ্যার ঘোনায় আব্বা জায়গা ক্রয়করে একটি মাটির ঘর বাধে । ১৯৭৪ সালে আব্বাকে বদলী করলে আমরা আবার গ্রামে চলে আসি ।১৯৭৫ সালে আমাদের সবার ছোট ভাই আলমগীরের জন্ম নেয় । আব্বা বেশী ভাগ চাকুরীর কারণে বাহিরের থাকতো সেই সুযোগে আমার জাঁ-রা (আমার জেটী মায়েরা ) বিভিন্ন ভাবে কলঙ্ক দেয় । আব্বা বাধ্য হয়ে চাকুরী ছেড়ে দিয়ে গ্রামে চলে আসে ।আব্বা ব্যবসা শুরু গ্রামে থেকে যান ।
এরপর আমরা গ্রামে থেকে লেখাপড়া শুরু করি । চিংড়ী ঘেরের দ্বন্ধ ও স্থাণীয় কর্তৃত্ব কারণে ১৯৮৫ সালে ১২ ডিসেম্বর তাহের খুন,১৯৮৭ সালে ২৭ এপ্রিল জব্বার খুন, ১৯৮৭ সালে ১৮জুন আব্বার ভাইপো ইসলাম খুন,১৯৮৯ সালে ১৪ এপ্রিল ছৈয়দ মিয়া খুন,২০০২ সালে ২রা ফেব্রূয়ারী রশিদ খুন, এসব মামলার রশিদ হত্যা ছাড়া পরোক্ষ প্রত্যক্ষ আব্বাকে আমাকে আসামী করা হয় । ১৯৮৯ সালে ১৬ জুন আব¦াকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে । আমাদের হালচাষে জমিতে চাষ বন্ধ করে দেয় সেই সময়কার গডফাদার জয়নাল লবণ চাষও বন্ধ করে দেয় । আমাদের আয়ের সবপথ বন্ধ করে দেয়।আমি লেখা পড়া বন্ধ করতে বাধ্য হই । ১৯৮৯ সালে আমি বাশখালী আলাওল কলেজের আই এ পরীক্ষা দেয়ার সময় আমাকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করা হলে অধ্যক্ষ রফিক স্যার ও ডাক্তার প্রভাত কুমারের পিতার সহায়তায় সেই দিন গ্রেপ্তার থেকে রক্ষা পাই । আমি রাতে অন্ধকারে বাশখালী থেকে মহেশখালীতে কোরবানের আগের দিন রাতে বাড়িতে ফিরি ।তখন মা নামাজ পড়ছিলেন নামাজ থেকে উঠে বিলাপ করে কান্না শুরু করে দেয়। তিনি বিলাপে বারবার বলছিলেন আমার লেখা পড়ার কি হবে । সেইদিন মাকে বলেছিলাম আমি বুড়ো বয়সে হলে উচ্চ শিক্ষিত নিজেকে গড়ে তুলবো। আমাদের উৎপাদিত লবণ বিক্রি করতে দিচ্ছে না ৪ বছর ধরে টাকার অভাবে আব্বার জামিন চাইতে পারছিলাম না। আমাদের সাত পরিবারের জমিতে উৎপাদিত লবণ গর্তে পড়ে আছে চার বছর ধরে ।স্থানীয় ভাবে প্রভাব খাটিয়ে জয়নাল ও তার স্ত্রী সরকারী কর্মকর্তা হওয়ায় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ৪টি হত্যা মামলায় আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে আমাদের এলাকার চারটি চিংড়ী ও লবন জোর করে দখল করে । কোন কমিটি ছাড়া জয়নাল গং ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল র্পযন্ত ভোগ করে আমাদের পরিবার ছাড়া বাকি জমির মালিকদেরকে নামে মাত্র মূল্যে পরিশোধ করে।১৯৯০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী চার বছর ধরে গর্তে পড়ে লবণ বিক্রি করতে গেলে জনতাবাজারে জয়নালের চাচা আমানতউল্লাহ আমাকে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করতে চেষ্টা করে । আমি সেইদিন মহেশখালী প্রবাহে নেমে পুলিশ অফিসার নুরুল হুদাকে বলি আমরা খুন করিনি যিনি বাদী তিনি খুনি । প্রকাশ্যে বাজারে ১৮৮৯ সনে আমার আব্বা ডা.মনছুরকে বাচাতে গিয়ে ছৈয়দ মিয়া খুন হয় মামলার বাদী কামাল হোছাইন। আমি সাতরিয়ে নদী ওপারে চলে যাই ।সেইদিন আমার মা আমার গ্রেপ্তারের কথা শুনে জনতার বাজার ধোয়াঘাটে ( এক সময়কার ষ্টীমার ঘাট) চলে আসে ।পুলিশের সাথে বাড়াবাড়ি করে ।পুলিশ মাকে বুঝিয়ে বলে । পুলিশ সম¯ত ঘটনার জানার পর আমাদেরকে লবণ মাপার ঘোষনা দিয়ে চলে যায় ।৯০ এর আমাদের লবণ উৎপাদন ও বিক্রি করতে পারি । আব্বা ১৯৯০ সালে ১৯ অক্টোবর জামিনে মুক্তিপায় এর আমার ছোট পুতু মামলা চালাতো তাকে অপহরন করে তাকে উদ্ধার করে খালাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে দিই । আমার মায়ে প্রেরনায় এসএসসি থেকে ইন্টার পর্যন্ত ঘ্যাপ দিয়ে ১৯৯২ সনে ইন্টার দিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান এ অর্নাস ও মাষ্টারস করি । মায়ের ত্যাগ ও প্রেরনায় তা করার সম্ভব করতে পেরেছি । আমার মা বাবা কক্সবাজার বৈদ্যার ঘোনায় ১৯৯৮ সন থেকে থাকতেন । আমি ফ্যামিলি নিয়ে চিটাগাং থাকতাম ।২০০৬ সালে ২৫ জানুয়রী মা রাতে প্রচুর প্রশ্রাব করে সকালে কক্সবাজার হাসপাতাল ভর্তি করে । হাসপাতাল থেকে চিটাগাং রেফার করে । হাসপাতাল থেকে মাকে বোন আনারকলি বাসায় নিয়ে আসে । আমাকে সকাল ১১টায় আব্বা ফোনে জানায় মা অসুস্থ । আমি সাথে সাথে গাড়ী উঠি ।আমি আড়াইটায় পৌছি । চিটাগাং আনার জন্য আম্মাকে এ্যামভুলেন্স তুলি ।শোয়ার সাথে তিনি মরা যায় আমার হাতের উপর প্রান যায় আমি দুবারকলমা পড়াই ।এ মৃত্যু কি ভাবে মানবো? কোন চেষ্টাই করতে পারিনি ।মায়ের স¥ৃতি আমাকে সারাক্ষণ তাড়া করে ।
Like ·
· Share
২৫ জানুয়ারী আমার মায়ের ৯ম মৃত্যুবার্ষিকী ও কিছু স্মৃতি
Written By grameenphoto on Friday, 23 January 2015 | 02:16
Related Articles
If you enjoyed this article just Click here Read Dhumketo ধূমকেতু, or subscribe to receive more great content just like it.

0 comments:
Post a Comment