Home » » আমার জীবনের ঘটে যাওয়া দুঃসময়ের দিন ১৮ জুন ইসলাম হত্যা ১৮ জুন ১৯৮৭

আমার জীবনের ঘটে যাওয়া দুঃসময়ের দিন ১৮ জুন ইসলাম হত্যা ১৮ জুন ১৯৮৭

Written By grameenphoto on Thursday, 18 June 2015 | 07:05

 ওচমান জাহাঙ্গীর--
-------------------
দুঃসময়ের একটি দিন ১৮ জুন। ১৯৮৭ সালে এই দিনে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। মহেশখালী দ্বীপটির সর্ব উত্তরে টেইট্টা ঘোনায় (চিংড়ি ঘের) চারিদিকে বৃষ্টির শব্দ। ঐ সময় খবর আসে আমার পরিবারের সদস্য ঘুমন্ত অবস্থায় ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমার পরিবারের সবাই এমনিতে আতঙ্কের মধ্যে ছিল। প্রতিপ যে কোন সময় টেইট্টা ঘোনা দখল নিতে পারে। বিগত বছর ১৯৮৬ সালে এসব ঘোনাগুলো প্রতিপ জোর করে খেয়ে ফেলেছে। এ বছরও একই ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। সেই আশঙ্কায় আমাদের গোষ্ঠীর বড় নাতি ইসলাম চিংড়ি ঘেরে পাহারারত ছিল। আমার ফুফাতো ভাই নুর মোহাম্মদ আমার চাচা সম্পর্ক আবদুর রশিদ, আলী হোসেন, মোহাম্মদ ইসলাম, আবদু সাত্তার সবাই পালা করে চিংড়ি ঘের পাহারা দিত। রাত ১২টা পর্যন্ত ইসলাম, আলী হোসেন, মোহাম্মদ সত্তার পাহারায় ছিল। এরপর সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। এ সময় হঠাৎ একটি গুলির শব্দ শুনা যায়। অন্যরা উঠে দেখে যে ইসলাম গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছে। ঐ সময় তিনি একটা কথাই বলেন, আমাকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এ কথা বলে সে প্রাণ ত্যাগ করে। উল্লেখ্য যে, তারা যে বাসায় ছিল তা শণের ছাউনি ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা। এটার উত্তর পার্শ্বে থু থু ফেলার জন্য ছোট একটা ছিদ্র ছিল। ঐ পাশে ইসলাম ঘুমিয়ে ছিল। ঐ ছিদ্র দিয়ে বন্দুকের নলি ঢুকিয়ে দিয়ে গুলি করা হয়। এতে ইসলামের কোমর থেকে গুলিটা বুকের ভিতরে চলে আসে। এ অবস্থায় সে মারা যায়। আমার আব্বা ডা. মনসুর আহমদ তখন চিংড়ি ঘের থেকে তিন কিলোমিটার দূরে নিজ গৃহে ঘুমাচ্ছিলেন। চিংড়ি ঘের লোক এসে জানায় যে, ইসলাম নিহত হয়েছে। আব্বা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য নিয়ে ইসলামকে দেখতে যায়। এরপরে প্রায় ১৯ কিলোমিটার দেিণ অবস্থিত মহেশখালী থানায় হেঁটে হেঁটে, কিছুদূর রিকশায় সকালে থানায় পৌঁছে। থানার ডিউটিরত কর্মকর্তা আব্বাকে দেখার সাথে সাথে বলে উঠেন, আপনার ভাইপো ইসলামকে হত্যা করে থানায় অভিযোগ দিতে এসেছেন? আব্বাকে ১২ ঘণ্টা বসিয়ে রাখে থানায়। পরে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় একটা হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এর কিছুদিন পরেই আমাদের আত্মীয়দের ধরে নিয়ে গিয়ে ইসলাম হত্যা আমরা করেছি বলে ৬৪ ধারায় রেকর্ড করার চেষ্টা করে পুলিশ। এই মামলাটি পরে সিআইডির নিকট হস্তান্তর করা হয়। সিআইডি অজানা কারণে আবার পুলিশের কাছে মামলাটি পাঠিয়ে দেয়। তৎকালীন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে আব্বাসহ আমার আত্মীয় স্বজনদেরকে আসামী করে একটি নতুনভাবে মামলা দায়ের করে। ঐ মামলার বাদী ঐ তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজেই। এরপর কিছুদিন ভিতরে ঐ মামলার চার্জশীট দেয়। চার্জশীটে আব্বাকে ১নং আসামী করা হয়। আব্বাসহ আমাদের পরিবারের সবাই পলাতক হয়ে যাই। এরই সুযোগে আমাদের প্রতিপ আমাদের চাষাবাদের জমি, চিংড়ি ঘের, লবণের মাঠ সব জোর দখল করে নেয়। এই ঘটনার আগে তাহের হত্যা ১৯৮৫, জব্বার হত্যা ১৯৮৭ তারই ধারাবাহিকতায় ইসলাম হত্যা। প্রতিটি হত্যা মামলায় আমাদেরকে প্রশাসনের মাধ্যমে আসামী করা হয়। মূলত এই ঘটনার মাধ্যমে আমাদের পতন শুরু হয়। আমরা গরিব থেকে আরো গরিব হয়ে যাই। মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় কোন রকমে বাঁচার চেষ্টা করি। আমার পলাতক জীবনে আমার লেখাপড়া বলতে গেলে একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। আমার উপর দুঃসময় নেমে আসে ১৯৮৫ সালের পর থেকেই। কয়েকবার পরীায় অংশগ্রহণ করেও ড্রপ দিয়ে পালিয়ে আসতে হয়। যেমন আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীা কক্সবাজার কলেজ ১৯৮৪-৮৫ সাল, সাতকানিয়া কলেজ ১৯৮৬-৮৭ সাল, আলাওল কলেজ ১৯৮৮-৮৯ সাল। অতপর ১৯৯২ সালে পলাতক অবস্থায় কুতুবদিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করি। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স, মাস্টার্স পাস করি। ১৯৮৯ সালে ১৪ এপ্রিল আমাদের প্রতিপক্ষে আব্বাকে হত্যার উদ্দেশ্যে স্থানীয় জনতা বাজারে হাজার হাজার লোকের সামনে গুলি করলে আব্বাকে বাঁচাতে গিয়ে আব্বার মামাতো ভাই সৈয়দ মিয়া নিহত হয়। এই মামলায় আব্বাকে ১নং আসামী করে মাত্র ৪৫ দিনের ভিতরে চার্জশীট দিয়ে দেয়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালের ভিতরে আমি ও আব্বাসহ প্রত্যেক মামলা থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পাই। আজ ১৮ই জুন ইসলাম হত্যা দিবস। ইসলাম আমাদের পরিবারের বড় নাতনি ছিল। তার অকাল মৃত্যুতে তার পরিবার যেমন তছনছ হয়ে যায়। আমরাও নিঃশেষ হয়ে যাই প্রতিপরে রোষানলে পড়ে। আইসিটি অ্যাক্টের বিবেচনা করে প্রতিপক্ষের নাম আমার এই লেখায় উল্লেখ করলাম না।

0 comments:

Post a Comment